![]() |
| ভাগীরথী |
হরশিল
একদল লোক আসছে অনেক ঘোড়া আর খচ্চর
নিয়ে। বরযাত্রী। তার সঙ্গে পুরুষ আছে বহু। কিন্তু, দলে
কুমারীর সংখ্যা আরও বেশি। বর বিয়ে করবে, করে
নিজের বাড়িতে ফিরতে পারে কিংবা এখানেই থেকে যেতে পারে। ওইসব কুমারীদের বিয়ে হয়ে যাবে এখানেই। তারা
এখানেই থেকে যাবে। তিব্বত থেকে আসছে তারা। আসছে গারওয়াল রাজ্যের হরশিলে।
১৮১৫ সালে নেপালের সঙ্গে যুদ্ধ
বেধেছিল। ইংরেজরা গারওয়াল রাজাকে সাহায্য করে। আর উপহারের নামে নিয়ে নেয় অনেকটা
ভূমি। সেই থেকে ইংরেজদের বোলবালা। অযাচিত বীরত্ব প্রদর্শন অন্যায় বায়নাক্কার কারণে
ব্রিটিশ সেনা এক তরুণকে তাড়িয়ে দেয়। ফ্রেডরিক উইলসন তার নাম। সে এসে হরশিলে
আস্তানা গাড়ে। গড়ে তোলে আপেলের বাগান, রাজমার
ক্ষেত। নিজের সুবিধার জন্য তৈরি করে পথঘাট। রাজার সঙ্গে তার অম্লমধুর সম্পর্ক।
হিউম, রুডইয়ার্ড কিপলিং তার বন্ধু। কথায়
কথায় রাইফেল বার করে। তার জ্বলবা এতই যে, ইংরেজরা
তাকে নিয়ে বইও লিখে ফেলে। কেউ অভিধা দেয় রাজা, কেউ বলে পাহাড়ি উইলসন। যাবার আগে উইলসনকেই আমি হরশিলের প্রতিষ্ঠাতা
হিসেবে জেনে গিয়েছিলাম। তার বাড়িটি এখন বন দফতরের বাংলো, সেখানে থাকব, এই ছিল
বাসনা। থাকা হয়নি, বুকড।
একটি টেন্ট ভাড়া করে গিয়েছিলাম।
ভাগীরথীর একদম পাড়ে গুচ্ছতাঁবু। কিন্তু সেখানেও থাকা হয়নি। রাস্তায় কত আত্মীয় জুটে
যায়। আশি বছরের তরুণ অশোক কোছাড়কে পেলাম, সঙ্গে
তাঁর সদাহাস্যময়ী স্ত্রী। তিনি যে অন্যের সাহায্য ছাড়া হাঁটতে পারেন না, কে বুঝবে ! দিল্লির ছটফটে তরুণ কপিল। ওজন কমানো
তার বিপুল উচ্চাশা। জুটে গেল। সঙ্গে সারথি আকাশ রুপানি। আন্টি ওই টেন্টের ঠান্ডায়
থাকতে দিলেন না। চলে এলাম হোটেলে। যাব গঙ্গোত্রী, আন্টি সাহস করলে গোমুখও চলে যেতে পারি।
আমরা পাপীতাপী। সারথি আকাশ সেটা
বুঝেছে। এই একমাত্র ড্রাইভার এক হাতে গাড়ি চালায়, অন্য হাতে জপের মালা। সারাক্ষণ তার ক্যুইজ কম্পিটিশন। শ্রীরামকে কে
শাপ দিয়েছিলেন? হনুমান ঠিক কোন ওষুধ নিয়ে গিয়েছিলেন
হিমালয় থেকে? বিপজ্জনক রাস্তা, পদে পদে মন্দির, আকাশ মাথা নোয়ায়। কেবল নোয়ায় না, স্টিয়ারিংকে দেবপদ ভেবে সে সেটাতে মাথা ঠেকায়, চোখ বন্ধ। উলটো দিকের গাড়ি তীব্র হঙ্ক করলে সে হকচকিয়ে জাগে। অশোক
আংকেলের মতন রসিক মানুষ আমি আর দেখিনি। আকাশকে প্রায় প্রতিটি ঘটনায় তিনি অতিশয়
বিনয়ের সঙ্গে জিগ্যেস করেন, ‘ইস বিষয়
মে তেরা গুরুজি কেয়া বিচার রাখতে হ্যায়?’ আকাশের
অচলা ভক্তি, সে রস বোঝে না –– বাত ইয়ে হ্যায় কি…
বলে আবার শুরু হয়ে যায়…
১৮ মে হৃষীকেশের নরেন্দ্রনগরে এক জঙ্গলের মধ্যে আশ্রয় নিয়েছিলাম। মনোরম, মনোরম। ২৩ তারিখ সন্ধ্যায় হরশিল। টেন্টের দুর্গন্ধ আর তীব্র শীত দেখে আন্টি প্রায় জোর করে তুলে আনলেন হোটেলে। বৃষ্টি হচ্ছে। চারদিকে বেদমন্ত্র উচ্চারিত হচ্ছে, দূরে কোথা থেকে ভেসে আসছে বুদ্ধপূজার স্তোত্রপাঠ। সন্দীপের সঙ্গে আলাপ হল। পাহাড়ি উইলসনের কথা বললাম। খুব বিরক্ত হল। তার মতে, উইলসনকে অকারণ অত ফাঁপিয়ে তোলা হয়েছে। একদা ভাগীরথী আর জলন্ধরী নদীর খুব বিবাদ হল। কে কত শক্তিশালী সেটা নিয়ে ঝগড়া আর দুজনে মিলে তীব্র আকার ধারণ করলেন। তখন শ্রীহরি এক বিরাট পাথরের আকার নিয়ে দুজনের মাঝখানে শুয়ে পড়লেন। সেই থেকে হরিশিলা, পরে হরশিল। উইলসনের আগেও তিব্বত-গারোয়ালি মিলে এ গ্রাম ছিল, এখনো আছে…
রাতে বৃষ্টি কমল। আকাশের কাছে গেলাম।
তীব্র, নিরঙ্কুশ আকাশ। ভেজা। রাত প্রথমে
রাত্রি, পরে রজনী এবং ধীরে নিশীথিনী হচ্ছেন।
আকাশ ভরা তারা। দাঁড়িয়ে থাকি। অনেক কুকুর এসে কেন যে আমার পাশে নীরবে ঘিরে বসল।
তাদের রাত্রির ভাগে ভাগ বসাচ্ছিলাম?
![]() |
| আন্টির পেছনে সর্বজ্ঞ শ্রীসারথি আকাশ |
আংকেলের ফোনে হোটেলে ফিরে আসি। তখনও উইলসনের গল্প হচ্ছিল। ইংরেজ তখন চারদিকে রেলবিস্তার করছিল। উইলসন, বন উজাড় করে প্রাচীন সব গাছ কেটে কেটে জলে ভাসিয়ে দিচ্ছিল। কাঠের ব্যবসায় শুরু করে সে। গ্রামবাসীরা ক্ষেপে যায়, এসব বৃক্ষ তো নিছক গাছ নয়। এক সন্ন্যাসী অভিশাপ দিলেন উইলসনকে, তুমিও সবংশে নাশ হবে। একদিন সে ঘরের মধ্যে মরে পড়ে ছিল। স্ত্রী তার আগেই মরে গিয়েছিল। দুটো ছেলে পরপর মরে যায়…
রাতে কী খাব জিগ্যেস করল সন্দীপ। সে
এই প্রপার্টিটা লিজে নিয়ে হোটেল চালায়। আংকেল দেরি না করে আমাদের শ্রীসারথি আকাশকে
জিগ্যেস করলেন, ‘ইস বিষয় মে কয়ি টিপ্পনি… কেয়া খানা
ঠিক রহেগা…’
২০২৩ এর জুনের ভ্রমণ
Harsil, Uttarakhand, Bhagirati


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন